Wednesday, December 12, 2018

ভারতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্প্রদায়িক জারক রস ছড়াচ্ছে

  • ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

ভারতে বর্তমানে রয়েছে বিজিপি সরকার। তারা হিন্দু মৌলবাদী হিসেবে কাজকর্ম করছ। অন্যধর্মের লোকদেরা নির্যাতন করছে। গরু খাওয়ার মতো সামান্য বিষয়ে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তবে গরু খাওয়ার জন্য সংখ্যালঘু মুসলিম হত্যার প্রতিবাদে সংখ্যাগুরু হিন্দুরা অনেক স্থানে গরু খেয়ে এর প্রতিবাদ করেন। বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন। লেখকরা পুরস্কার ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এতে করেও  থামছে না কিছুই। উল্টো বেড়ে যাচ্ছে তাদের মৌলবাদী আচরণ। মৌলবাদের বিষবাষ্পে পিষ্ট হচ্ছেন মুক্তবুদ্ধির মানুষজন। মুক্তচিন্তা চেতনার মানুষজন আজ ভারতে নিরাপত্তাহীন। তারাও খুন হচ্ছেন। হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনে এই বিজিপির বিজয় পতাকা উড়ছেই।

ভারতের মানুষজনও যেন এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সমর্থন করেন। উত্তর পূর্ব ভারতের ত্রিপুরার নির্বাচনে ৩০ বছরের বাম শাসন পরাজিত হয়েছে হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদী দলের কাছে। ক্ষমতাসীন জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যে শুরু হয় তাণ্ডব। নির্বাচনের পরপরই সহিংসতা মারাত্মক রূপ নেয়। বিভিন্ন জায়গায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-মার্কসবাদী বা সিপিআই-এমের দলীয় কার্যালয় ও কর্মীদের বাড়িঘরে ভাংচুর চালায় মৌলবাদী বিজেপি কর্মীরা। ত্রিপুরার বিলোনিয়ায় বিমানবন্দরের কাছে রাস্তার মোড়ে ভ্লাদিমির লেলিনের ভাষ্কর্যটি বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে দেয়। ভোটে জিতেই আসাম রাজ্যের নেতা হেমন্ত বিশ্বশর্মা রাজ্যটির গত ২০ বছরের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বলেন। কি ভয়ানক মানসিকতা। আমরা যে শুনতাম ভারত নাকি বিশ্বের এক নম্বর গনতন্ত্রের দেশ। এই কি তার নমুনা?

ভারতেও লেখকদের সেল্ফ সেন্সর করতে হয়। লেখকরা হত্যার শিকার হন। সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে এরই মধ্যে সাহিত্য পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন অন্তত ৪০ লেখক-সাহিত্যিক। হিন্দু ধর্মের সমালোচনার জন্য এক নাস্তিক লেখককে হত্যা এবং গরু খাওয়ার অভিযোগে এক মুসলমান বৃদ্ধকে খুনসহ নানা ছোট-বড় সাম্প্রদায়িক সমস্যার প্রতিবাদেই পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সাবেক কর্মী এবং সাবেক কূটনীতিক সুধীন্দ্র কুলকার্নির মুখে কালি লেপে দেওয়া হয়। তার দোষ, পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুরশিদ মাহমুদ কাসুরির একটি বই প্রকাশের আয়োজন করা। কুলকার্নির সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় যথেষ্ট সমালোচনাও হয়েছে। অনলাইন বা অফলাইন সবখানেই  হয়েছে এই বিতর্কে। এসব কারণে আমরা বলতেই পারি, ভারতে  প্রকাশ্যে মুসলিম সম্প্রদায়, নাস্তিক বা হিন্দু সম্প্রদায়ের সমালোচনাকারীদের প্রতি সবসময় নির্মম আচরণ করছে। ওখানে মৌলবাদীর আচরণ আরও ভয়ঙ্কর।

রুশদির মতো টুইটারে সরকারের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। তিনি পুরস্কার ত্যাগ করা লেখকদের উদ্দেশে হ্যাশট্যাগ দেন ‘রায়োটার্স কোয়েশ্চেন রাইটার্স’। এই হ্যাশট্যাগের নিচে ১৭ হাজার টুইট পড়ে! এর মধ্যে হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টারের মতো কিছু লোকও রয়েছে। তিনি বলেন, ভারতে বসবাসকারী মুসলমানদের উচিত গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া। ভারতের সুধীসমাজের লোকজন এ প্রসঙ্গে বলেন, কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী মোদির অধীনে এ রকমই যে হবে তা তাঁরা গত কয়েক বছর ধরেই বলে আসছিলেন। তাঁদের যুক্তি হলো, ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময় মোদি ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি দাঙ্গা থামাতে কোনো ভূমিকা নেননি। তিনি বিভেদ সৃষ্টিকারী। অসহিষ্ণুতা প্রসঙ্গে তাঁর আজকের অবস্থানও একই। এসব কর্মকান্ডের কারণে ভারতকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয় ভয়ঙ্কর মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে উপাধী দেওয়াই যায়। অনলাইনে মোদির অনুসারির সংখ্যাও কম নয়। তাদের যুক্তি, মোদি ঐক্য সৃষ্টিকারী মানুষ। ভারতে এমন অসহিষ্ণু সময় আগেও এসেছে। তাহলে এ নিয়ে এখনই এত আহাজারি কেন?

অনলাইন একটিভিস্ট এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কর্মী আকর পাতিল বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছে এই ঘটনাপ্রবাহ, যা গত দেড় বছরে সুধীসমাজ পায়নি। তারা পরিস্থিতির ফায়দা নিচ্ছে।’ সরকার সমর্থকরা অবশ্য অসহিষ্ণুতার বিষয়টি মানতেই রাজি নয়। বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র নরসিমা রাও বলেন, মুসলিম হত্যা দুর্ভাগ্যজনক। তবে এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তিনি দাবি করেন, যা ঘটছে সবই বিরোধীদের প্রচারের কারণে। তাহলে দোষ কার? একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে জানান হয়, গত বছর সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ৩০৭ জন নিহত হয়েছে।

বাড়িতে গরুর মাংস রাখার অভিযোগ তুলে মোহাম্মদ আখলাক নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে আর পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হয়। গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে ভারতের উত্তর প্রদেশের দাদরি গ্রামে এ হামলায় আহত হয় আখলাকের ২২ বছর বয়সী ছেলেও। তবে আখলাকের পরিবারের দাবি, তাদের ফ্রিজে খাসির মাংস ছিল, গরুর মাংস নয়। খামারকর্মী আখলাকের ১৮ বছর বয়সী মেয়ে সাজিদা গণমাধ্যমকে জানান ঐদিন রাতে গ্রামের শতাধিক বেশি মানুষ তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা ঘরের দরজা ভেঙে ফেলে তার বাবা এবং ভাইকে পেটায়। আখলাককে ঘর থেকে টেনে বের করে নিয়ে গিয়ে পেটানো হয় ইট দিয়ে। আখলাকের মেয়ে ও স্ত্রী তখন পালিয়ে জীবন বাঁচিয়েছিলেন। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে কিছু বললে বা লিখলে আক্রমণের শিকার হচ্ছেন লেখকরা। এসব ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার জোয়ার নেমেছে। আমরা তাদের সাহসী পদক্ষেপকে জানাই অভিনন্দন। এরপরও গরুর নামে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে হামলা অব্যাহত রয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর আসছে। সমাজের সর্বস্তরে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষের পক্ষে কথা বলাটা কবি, লেখক, শিল্পীদের একটা সামাজিক দায়িত্ব। অথচ, এ দেশে সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তাঁরা খুন হচ্ছেন। লেখকরা হত্যার শিকার হচ্ছেন, নিরীহ মানুষ হত্যার শিকার হচ্ছেন, গজলশিল্পীদের অনুষ্ঠান করতে নিষেধ করা হচ্ছে। ভারতীয় গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ছে’ বলে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য অ্যাকাডেমিপ্রাপ্ত লেখক-সাহিত্যিকরা রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। রাজ্যের আরও কয়েকজন লেখক-শিল্পী তাদের প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন। সবমিলিয়ে ১০০ জন প্রতিবাদীর পক্ষে এ চিঠিতে লেখা হয়েছে, ভারতে হত্যা ও অসহিষ্ণুতার আবহ তৈরি হয়েছে।

ভারতের ব্যাঙ্গালোর শহরে সিনিয়র নারী সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশকে নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি হিন্দুত্ববাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন । দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত কলম ধরতেন।২০১৩ সালের অগাস্টে হত্যা করা হয় নরেন্দ্র দাভোলকরকে। অন্ধবিশ্বাস বিরোধী ও যুক্তিবাদী আন্দোলনের নেতা মি. দাভোলকর ছিলেন মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা। প্রায় তিন দশক ধরে  ভণ্ড সাধুবাবাদের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন তিনি।২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রেরই এক কমিউনিস্ট বিধায়ক গোবিন্দ পানসারেকে হত্যা করা হয়। তিনিও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রচার চালাতেন। যুক্তিবাদী ও দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে সরব হয়ে নিহত হওয়ার সবথেকে আলোচিত ঘটনাটি কুলবর্গী হত্যা।লেখক ও যুক্তিবাদী নেতা এম এম কুলবর্গীকে কর্ণাটকে তাঁর বাড়ির সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

তাছাড়া আসামে রয়েছে বাংলাদেশী খেদাও চক্রান্ত। বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে তাদেরকে এখনও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চক্রান্ত চলে। বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাঙালি জাতির প্রতি বদ্ধমূল ঘৃণা ও বিদ্বেষকে গত তিন বছরে উসকে দিয়েছে। উত্থান ঘটেছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষে যুক্তিহীনভাবে বিভাজিত হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি। বাঙালিমাত্রই কেন ‘বাংলাদেশি’ উগ্র অসমিয়া আধিপত্যবাদীদের কাছে? বাংলাদেশি শব্দটা কি গালাগাল? যদি তা-ই হবে, রাষ্ট্রীয় স্তরে ভারত ও বাংলাদেশ ভালো বন্ধু হয় কেন? ভারতের সংবিধানে বাংলা ভাষা শুধু স্বীকৃতই নয়, তাদের জাতীয় সংগীতের ভাষা। এই অপরাধে ভারতের বাঙ্গালিদের  রোহিঙ্গার মতো ভাসমান জনগোষ্ঠী করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে?

সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে যে নাগরিকপঞ্জির খসড়া প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তাতে নাম নেই আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য্যরে। অথচ তার বাবা তারাপদ ভট্টাচার্য স্বাধীনতাসংগ্রামী, ভারত সরকারের তা¤্রপত্র প্রাপক (সরকারের বিশেষ পদক) এবং তিরিশের দশক থেকে শিলচরের বাসিন্দা। এমনকি ১৯৬২ সালে তিনি আসাম বিধানসভায় নির্বাচিতও হয়েছিলেন। আর তপোধীর ভট্টাচার্য্যে গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনটি বিষয়ে এমএতে প্রথম হয়েছিলেন। ২০০৭ থেকে ২০১২ অবধি আসাম কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ছিলেন। নিয়োগকর্তা স্বয়ং ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। তাহলে তপোধীর ভট্টাচার্য্যে ও তার পরিবারের সব সদস্য নাগরিক নন কেন? বাঙালি বলে? শিলচর মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ দেবিদাস দত্ত, বিখ্যাত লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী সঞ্জীব দেবলস্কর (যাঁর পরিবার ১৫০ বছর ধরে এখানে রয়েছে), বিখ্যাত চিকিৎসক ধ্রুবজ্যোতি পাল, অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক বিভাস চৌধুরীদের নামও নেই তালিকায়! আসামে যাঁরা থাকেন, তাঁরা সবাই অসমিয়া নন। অসমিয়াদের সঙ্গে আছে প্রচুর বাঙালি, হিন্দিভাষী, বড় জনগোষ্ঠী, ডিমাসা-কার্বি-মিশিং-আহোম-মৈতৈ-মণিপুরি-বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি-মারা প্রভৃতি ক্ষুদ্র জনসমাজ। এদের সবাইকে সহাবস্থানের পাঠ দেওয়ার বদলে দেশভাগ, অর্থাৎ স্বাধীনতার সময় থেকে আধিপত্যবাদী অসমিয়া রাজনৈতিক সমাজ বেপরোয়াভাবে অসমিয়াকরণের নীতি অনুসরণ করেছে। এসব মৌলবাদী আচরণ। এগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করা হচ্ছে। পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হচ্ছে। সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ, এই তকমাটা ঝেড়ে ফেলে দিক ভারত।

লেথক: মুক্তমনা লেখক

সর্বশেষ সংবাদ