Sunday, January 20, 2019
সর্বশেষ সংবাদ
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল হবে না: আইনমন্ত্রী         বিরোধীদের নির্মূলে সরকার মরিয়া: মির্জা আলমগীর         পুনঃনির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নামছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বাম জোট         বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ৩ দিন বন্ধ থাকবে         কোম্পানীগঞ্জে গর্তে পড়ে আবারো এক শ্রমিক নিহত         সিসিকের বকেয়া বিল আদায় অভিযান অব্যাহত, ৭ দিনে ৩৩ লাখ টাকা আদায়         ছড়া-খাল দখলকারীরা যত বড় প্রভাবশালী হোক, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা-সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী         নগরীতে ‘বৈকালিক সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন’ টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল—সিসিকের প্রধান নির্বাহী         চার দেশে আশ্রয় চাইলেন আলোচিত সৌদি যুবতী কুনুন         ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: স্থগিত ৩ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ চলছে        

মিশা-পূর্ণিমার ধর্ষণ নিয়ে হাস্যর, ফেসবুকে সমালোচনার ঝড়

নিউজ সর্বশেষ ২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশে একটি টেলিভিশনে চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা এবং পরিচিত খলনায়ক মিশা সওদাগরের একটি কথোপকথন নিয়ে ফেসবুকে তীব্র সমালোচনা চলছে।

অনুষ্ঠানে পূর্ণিমা মিশা সওদাগরের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় হাস্যোচ্ছলে তাকে প্রশ্ন করেন, …”আপনি কতবার ধর্ষণ করেছেন”।

মি সওদাগর উত্তর দেন, “যতবার ডাইরেক্টর বলেছেন ততবার..”

আবারো হাস্যোচ্ছলে পুর্নিমার পরের প্রশ্ন ছিল- “(ধর্ষণের দৃশ্যে) কার সাথে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন”? উত্তর ছিল – মৌসুমি এবং পূর্ণিমা

টিভিতে এ ধরণের কথোপকথন নিয়ে ফেসবুকে যারা সমালোচনা করছেন তাদের বক্তব্য – যে দেশে শিশুও ধর্ষণের শিকার হয় সেখানে ধর্ষণ নিয়ে আলাপে টেলিভিশনের পর্দায় হাস্যরস কেন?

অনেকে আবার এ প্রশ্নও তুলছেন – বাংলা চলচ্চিত্রে যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনার এমন উপস্থাপনা কি সেগুলোকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে?

বাংলা সিনেমা সহ এই উপমহাদেশের সিনেমার একটা অতি পরিচিত ফর্মুলা আছে। কিছু নির্দিষ্ট দৃশ্য প্রচুর সিনেমায় ঘুরে ফিরে আসতে দেখা যায়। যেমন নায়িকা ও তার বান্ধবীদের পিছু নিয়ে গান গাইছেন নায়ক, কখনো সিটি দিচ্ছেন অথবা টিকা টিপ্পনী ছুড়ে দিচ্ছেন।

সিনেমায় এটিকে নায়িকার মন ভোলানোর চেষ্টা হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তব জীবনে এটি যৌন হেনস্থার সামিল বলে বিবেচিত হবে।

একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ঐ সাক্ষাৎকারটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ সোচ্চার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন।

তিনি বলছেন, “পূর্ণিমা যে খুব স্বাভাবিক ভাবে অন্য আর যেকোনো প্রশ্নের মতোই কতবার ধর্ষণ করেছেন এই প্রশ্নটি করেছেন বা মিশা সওদাগরের সাথে যে এই বিষয়টি নিয়ে টেলিভিশন পর্দায় হাসাহাসি করেছেন, তার কারণ অধিকাংশ ছায়াছবিগুলোতে ধর্ষণ একটি বিনোদন দৃশ্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়।”

“সিনেমায় ধর্ষণকে খুব স্বাভাবিক করে তোলার ফলে ধর্ষণের মতো অত্যন্ত একটা ভয়ঙ্কর অপরাধের প্রতিক্রিয়া দেখানোর ব্যাপারেও কিন্তু আমরা অসার হয়ে পড়ি।”

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণা করেছেন গীতি আরা নাসরিন। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি লিখছেন, “ফর্মুলা ফিল্মগুলোতে ধর্ষণ যতবার উপস্থিত হয়, তা গল্পের প্রয়োজনে নয়। ধর্ষণ উপযোগী করে চিত্রনাট্য রচিত হয়। তার সঙ্গে থাকে যৌন নিপীড়নের রোমান্টিকীকরণ।”

বাংলাদেশে সিনেমা হলে এমনকি যৌন নিপীড়নের দৃশ্যে দর্শকদের তালি বাজানো বা ইঙ্গিত মূলক কথাবার্তা পর্যন্ত বলতে দেখা যায়। গীতিআরা নাসরিন বলছেন সিনেমার এমন দৃশ্য ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের প্রতি মানুষজনের সহনশীল মনোভাব তৈরি করছে।

তিনি বলছেন, “শুধু আইন দিয়ে প্রতিরোধ নয়, ধর্ষকের মনোভাব একটি সমাজে কিভাবে তৈরি হয় সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। সিনেমার মতো একটা অডিও ভিজুয়াল মাধ্যম মনোভাব সৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে…ধর্ষণের প্রতি সহনশীল মনোভাব কিভাবে সিনেমার মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে এই আলোচনাটা এখন হওয়া অত্যন্ত জরুরী।”

কিন্তু এমন দৃশ্য বাংলা সিনেমায় কিভাবে এলো?

বাংলা চলচ্চিত্রের পরিবেশক ও সিনেমা নিয়ে অনেক দিন ধরে সংবাদমাধ্যমে কাজ করছেন সৈকত সালাউদ্দিন। তিনি বলছেন, বাংলা সিনেমায় এমন দৃশ্যের ব্যাবহার শুরু ৮০’র দশকে হিন্দি সিনেমার অনুকরণে।

তিনি বলছেন, “এই বিষয়গুলো আমাদের সিনেমায় তখনই ঢুকেছে যখন আমাদের পাশের দেশের সিনেমাকে অন্ধ অনুকরণ শুরু হয়। হিন্দি সিনেমায় আশি ও নব্বইয়ের দশকে বেশ কিছু অপসিনেমা হয়েছে। সেগুলোকে নকল করার একটা ট্রেন্ড বাংলাদেশের সিনেমায়ও আসে।”

তিনি আরো বলছেন, “যারা নির্মাণ করছেন এটা তাদের রুচির অবক্ষয় কিন্তু আরো একটা প্রশ্ন তুলতে চাই সেটা হল বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ড যখন অনেক বিষয়ে সতর্ক ও কঠোর তখন এধরনের দৃশ্য কিভাবে ছাড় পেয়েছে সেটি আমার কাছে অনেক বড় প্রশ্ন।”

বাংলাদেশের সিনেমার আর একটি নিয়মিত বিষয় হল – প্রেম। কিন্তু প্রেমের দৃশ্যে অনেক কিছুই এড়িয়ে যান বাংলাদেশের পরিচালকেরা। সেন্সর বোর্ডও নারী পুরুষের প্রেমের দৃশ্যে অনেক কঠোর।

যেখানে চুম্বনের দৃশ্য বাংলা সিনেমায় এখনো দেখানো হয় না সেখানে ধর্ষণের দৃশ্যে ভিলেন হিংস্র-ভাবে মেয়েটির শাড়ি খুলে ফেলছেন সেই দৃশ্য ঠিকই দেখা যায়। তার কারণ কি?

পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর বলছেন, “ধর্ষণের দৃশ্য হলিউড, বলিউডে বা কলকাতায় আরো নেকেডভাবে দেখানো হয়। এটা বাণিজ্যিক চিন্তা করে করা হয়েছে। আবার চরিত্রের প্রয়োজনেও করা হয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “একজন পরিচালক হয়ত এমন সিন ব্যবহারের পর সেটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে …আমাদের এখানে একজন আরেকজনকে দেখে কাজ করার প্রবণতা বেশী”।

তবে অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন বলছেন, বাংলাদেশে যৌন সহিংসতা একটা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেই পরিস্থিতিতে সিনেমার পর্দায় ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে আলাপের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে পূর্ণিমা আর মিশা সওদাগরের কথোপকথন।

তার মতে, “সিনেমা জগতের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের দায়িত্ব এই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা যৌন অপরাধের স্বাভাবিকীকরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এ অবস্থার পরিবর্তনে কাজ করা, এ নিয়ে হাসাহাসি করা নয়।”

সর্বশেষ সংবাদ