বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আত্মশুদ্ধির মাস ‘মাহে রমজান’



নিউজ সর্বশেষ২৪রিপোর্ট: মানুষ অভ্যাসের দাস। আর অভ্যাস প্রয়োজনের সন্তান। মানুষ যদি প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে, তবে সে মানুষ নয়, ফেরেশতা হয়ে যায়। এখানে বিবেচ্য- মানুষের প্রয়োজনের কোনো সীমা আছে কি না? যদি থাকে- তবে তা কী? মানুষের সীমাহীন কৃত্রিম প্রয়োজনকে বাদ দিলে মৌলিক প্রয়োজন হলো ‘পান’ ও ‘আহার’। একজন মানুষের জীবিত থাকার জন্য কিছু খানা ও কিছু পানির দরকার। এরপর যাবতীয় প্রয়োজন ও দু’টিকে কেন্দ্র করে রুচি ও আকাঙ্ক্ষার পরিমন্ডলে জন্মলাভ করে। মানুষ ও ফেরেশতার মাঝে পার্থক্য এ প্রয়োজনের কারণেই। মানুষের পাপ ও অপরাধের যদি খতিয়ান তৈরি করা হয়, দুনিয়ার তাবৎ অন্যায়-অবিচারের যদি সূচিপত্র রচনা করা হয়, তবে দেখা যাবে যে, জীবন ধারণের এ দু’টি মৌলিক বস্তুর সীমাহীন চাহিদা এবং ভোগ-লালসাই এসব কিছুর উৎস।

এ কারণেই দুনিয়ার সব দেশে সব যুগে ভোগবাদিতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সব ধর্মেই রোজার প্রচলন ছিল। মানুষ যেহেতু পানাহার বর্জন করলে বাঁচতে পারে না, তাই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ সময়ে তাকে সে সব মানবীয় প্রয়োজনীয়তা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে, যা সাময়িকভাবে পরিহার করা সম্ভব। যাতে মানুষ তার চাহিদার পরিধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয় এবং প্রকৃত সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সে ‘আলমে মালাকুতের মাখলুকাতের’ সাথে একাত্ম হতে পারে। রমজানের রোজা মানব জীবনে প্রতিবছর এমনি একটি সুযোগ এনে দেয়। এ সময় তারা হেরাগিরির মহাসাধকের স্মরণে মানুষের মুক্তি সনদ আল-কুরআনের অবতীর্ণ হওয়ার শুভলগ্নকে পালিত ও অভিষিক্ত করার উদ্দেশ্যে দেহ ও মনের পবিত্রতা ও একাগ্রতা দিয়ে সিয়াম পালন করে ‘মুত্তাকী’-এর অন্তর্ভুক্ত হয়। রোজা কেবল উপবাস ও দৈহিক কৃতজ্ঞতা সাধনের নাম নয়। রোজা ফেরেশতা স্বভাবের বহিঃপ্রকাশের নাম। যে কেউ রোজা রাখে; কিন্তু মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, জাহেলী কাজ থেকে বিরত থাকে না, তার রোজা আল্লাহর জন্য নয়, লোক দেখানো রোজা।

নবী করীম (স) বলেছেন- দেহ ও আত্মার সমন্বয় মানুষ। ইসলামের ইবাদত দেহ ও আত্মার সাথে সম্পৃক্ত। মানুষ আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে তার দেহ ও আত্মা দিয়ে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে দেহের তুলনায় রূহের আনুগত্যই প্রকৃত ইবাদত। সালাত নবুয়্যতের একাদশ বছরে মক্কায় ফরজ করা হয়। আর রোজা ফরজ হয় মদীনায় দ্বিতীয় হিজরীতে। মক্কায় মুশরিকদের বিরোধিতার দরুন নামাজ আদায় করা নবদীক্ষিত মুসলিমদের জন্য বিপদের কারণ ছিল। তবুও মক্কায় নামাজ ফরজ করা হলো। যদি রোজা মক্কায় ফরজ করা হতো, তাহলে নামাজের তুলনায় রোজা রাখা সহজতর হত। কিন্তু ইসলামে ইবাদতকে আত্মার ব্যাধির ওষুধ হিসেবে নির্ধারিত করা হয়েছে।

ওষুধ তো প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক দু’ধরনের হয়। রোগ দেখা দিলে অথবা রোগের সম্ভাবনা থাকলেই ওষুধ ব্যবহার করা হয়। যে পার্থিব ক্ষমতা ও সম্পদ, লোভ-লালসা, কামনা ও বাসনার দ্বারকে অবারিত করে আত্মাকে আবিল ও পঙ্কিল করে দেয়, তা মক্কায় মুসলিমদের হাতে ছিল না বরং কাফিরদের অত্যাচার ও নির্যাতন তাদের অন্তর থেকে এসব অনুভূতিকে বিলুপ্ত করে আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুলকে দৃঢ়মূল করে দিয়েছিল। মদীনায় হিজরতের পর অবস্থার পরিবর্তন হলো। আনসারদের সহমর্মিতা মুহাজিরদের করল জীবন-জীবিকা সম্পর্কে আশ্বস্ত। বিজয়ের পালা শুরু হলো। দুনিয়া আসলরূপে তাদের কাছে উপনীত হতে শুরু করল। এ ছিল নশ্বর কাল যাতে রোগ সৃষ্টির পূর্বেই প্রতিষেধক ব্যবহার করা যায়। তাই রোজা ফরজ করে মুসলিম আত্মাকে সম্পদ ও ক্ষমতার কারণে সৃষ্ট ব্যাধি হতে মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা হলো। জৈব চাহিদা পরিহার করা কঠিন কাজ, তাই মানুষ যখন তাওহীদ, আখিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম, সালাত ইত্যাদি কুরআনী শিক্ষার সাথে পরিচিত হলো, তখনই রোজা ফরজ করা হলো। ইসলাম একজন অভুক্ত দরিদ্রের চেয়ে উদরভর্তি একজন বিত্তবানের জন্য রোজার প্রয়োজন অনেক বেশি।

আদিকাল থেকেই সবদেশে ও সব জাতির মধ্যে কোনো না কোনোভাবে রোজা বা উপবাসের প্রথা প্রচলিত ছিল। ভারতের হিন্দু ব্রাহ্মণরা একাদশীর উপবাস ও কার্তিক মাসের প্রতি সোমবার রোজা রাখতেন। জৈন ধর্মাবলম্বিরা সপ্তাহব্যাপী রোজা রাখতেন। তারা হিন্দু যোগীদের ন্যায় ৪০ দিন পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন। প্রাচীন মিসরীয়রা অনুষ্ঠান করে রোজা রাখতো। গ্রীসে কেবল মেয়েদের জন্য রোজা রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। পারসিকদের ধর্মযাজকদের ওপর রোজা ফরজ ছিল। ইয়াহুদীরা মূসা (আ)-এর তূর পাহাড়ে ৪০ দিন পানাহার ছাড়া অতিবাহিত করাকে স্মরণ করে ৪০ দিন রোজা রাখে এবং ৪০ তম দিন, যা তাদের সপ্তম মাসের (শাহরে তাশরীন) ১০ম দিন হয়, তা আশুরা বলে খ্যাত। ঐ দিন তাদের রোজা রাখা ফরজ। ইয়াহইয়া (আ) ও ঈসা (আ)-এর অনুসারীরাও রোজা রাখতেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ঘটনাকে উপলক্ষ করে রোজা রাখার প্রচলন ছিল। কখনও দুঃখ প্রকাশের জন্য আবার কখনও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য রোজা রাখার নিয়ম ছিল।

ইসলামে রোজার জন্য তিনটি উদ্দেশ্য নির্দেশ করা হয়েছে- তাকওয়া, তাকবীর ও শোকর। বান্দা রোজার মাধ্যমে তাকওয়ার গুণে ভূষিত হবে। সে আল্লাহর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন করার জন্য তার নির্দেশ মেনে চলবে। রোজা যার হৃদয়ে এ তিন অবস্থার সৃষ্টি না করবে, সে রোজাদারের জন্য ক্ষুৎ-পিপাসায় কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কিছু পাওয়ার নেই। নবী করীম (স) বলেছেন, যে কেউ ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রোজা রাখবে, তার পূর্বকৃত যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।

রোজা রোজাদারকে কুপ্রবৃত্তি, অনাচার, অশ্লীলতা, মিথ্যাচার অবাধ্যতা, বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি থেকে রক্ষা করে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায়। তাই রোজাকে বলা হয়েছে ঢাল এবং এর পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ। মানুষের যাবতীয় আমল তার জন্য। কিন্তু রোজা আমার জন্য। আর আমিই এর পুরস্কার।

প্রকৃত ভাগ্যবান তো সে, যে রোজার ঢালের আড়ালে অবস্থান করে ফেরেশতা স্বভাবের অধিকারী হয় এবং কুপ্রবৃত্তির দাসত্বের নিগূড় থেকে মুক্ত হয়ে নেকী ও কল্যাণের পূর্ণাঙ্গ নমুনার অধিকারী হয়। এ মাসে একজন মু’মিন নিবিষ্টভাবে আল্লাহর কাছে নিজেকে নিবেদন করে। সে মানবীয় আকর্ষণের বেড়াজাল ডিঙিয়ে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে জাগ্রত হয় প্রকৃত আল্লাহর বান্দারূপে। যাদের সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা- এদেরই জন্য রয়েছে তাদের রব আল্লাহর তরফ থেকে ক্ষমা ও জান্নাত, যে জান্নাতের পাদদেশে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। কত উত্তম নেককারদের পুরস্কার।